ব্রেকিং নিউজ

x


একশত বছরের ও আগের এক বীর বাঙালির গল্প

সোমবার, ২৫ মে ২০২০ | ১০:৫১ অপরাহ্ণ

একশত বছরের ও আগের এক বীর বাঙালির গল্প
রাসবিহারী বসু।

একশো’র’র কিছু বেশী বছর পিছিয়ে চলুন না।লর্ড হার্ডিঞ্জকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে।তবে কেন তিনি লর্ড হার্ডিঞ্জকে পৃথিবী থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন? আলিপুরের বোমা মামলায় গ্রেফতার হওয়ার একটা আশঙ্কা মনে ছিল৷ কলকাতা ছাড়লেন তিনি। দেরাদূনে গিয়ে ফরেস্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের হেড ক্লার্কের একটি কাজ যোগাড় হল৷কিন্তু মন পড়ে কলকাতায়৷ভারতের স্বাধীনতা অর্জন আর ইংরেজদের আচ্ছা করে শিক্ষা দেওয়াই তখন জীবনের মূল ব্রত৷ যতীন মুখোপাধ্যায় (বাঘা যতীন) আর ‘যুগান্তর’ গোষ্ঠীর অমরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বসে নিখুঁত পরিকল্পনা তৈরি হয়৷

উদ্দেশ্য দুটি, ব্রিটিশরাজকে বার্তা দেওয়া আর  লর্ড হার্ডিঞ্জকে চিরতরে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া৷ লর্ড হার্ডিঞ্জকে পৃথিবী থেকে চিরতরে সরানোর ভার পরে বিপ্লবী বসন্ত বিশ্বাসের উপর।অনেক অপেক্ষার পর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। দিল্লিতে রাজা পঞ্চম জর্জের সঙ্গে দেখা করে ফিরছিলেন হার্ডিঞ্জ। সেই সময়ে ভাইসরয়কে লক্ষ্য করে বোমা ছোড়েন বসন্ত। বোমা অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।কিন্তু সঠিক বার্তাটা যায় ব্রিটিশ রাজের কাছে৷বিপ্লবীরা যে একেবারে চুপচাপ নেই,বরং ভারত থেকে ব্রিটিশ রাজের শিকড় উপড়ে দেওয়ার কাজে তারা যতেষ্ট সক্রিয়৷ সন্দেহভাজনদের তল্লাশিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ব্রিটিশ পুলিশ। বিপ্লবী কাজের অনেক অভিযোগ ছিল বসন্তর বিরুদ্ধে।পুলিশের হাতে ধরা পড়েন এই বীর বিপ্লবী৷ ১৯১৫-র ১১মে পঞ্জাব জেলে তাঁর ফাঁসি হল।দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মবলিদান দেওয়া ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের পাখির চোখ তখন বসন্তর গুরু রাসবিহারী বসু। পুলিশ তাঁর খোঁজে যেন হন্যে উঠেছে৷



খোঁজ দিতে পারলে মোটা অর্থের পুরস্কার ঘোষণা হল।রাসবিহারী বুঝলেন ভারতে থেকে দেশের স্বাধীনতার জন্য কাজ করা তাঁর পক্ষে মুশকিল৷কারন ব্রিটিশ পুলিশের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক,সঙ্গে তখনও বিপ্লবীদের মধ্যে যে বিশ্বাসঘাতক নেই এমনটাও হলফ করে বলা কঠিন৷ধরা পড়লে বিচারের নামে হবে প্রহসন,হবে নিশ্চিত ফাঁসি৷বিপ্লবী মানুষটি বুঝলেন আপাতত তাকে ভারত ছাড়তে হবে৷সত্যি কথা বলতে কি দিল্লীতে লর্ড হার্ডিঞ্জ-হত্যা পরিকল্পনা বোধহয় ছিল বিপ্লবীদের প্রথম সশস্ত্র বিপ্লবের পদক্ষেপ৷সেই মিশন ব্যর্থ হলেও তারা মোটেও মনোবল হারাননি৷ সুযোগের সন্ধানে চলছে অপেক্ষা আর ধৈর্য্যশক্তি পরখ করার পালা৷অচিরের যেন সুযোগ এল লাহোরে৷বিপ্লবী শচীন্দ্রনাথ সান্যালের গুপ্তদলের সঙ্গে ১৯১৩ সালে রাসবিহারী বসু পাঞ্জাবের ক্যাপ্টেন গর্ডনকে হত্যা করার পরিকল্পনা করলেন৷

লাহোরের লরেন্স পার্কে গর্ডন সাহেবের আসার কথা৷ রাসবিহারী বসন্তগুপ্তের উপর লরেন্স পার্কে সভা স্থলের কাছে বোমা রেখে আসার ভার দেন ৷কিন্তু বোমাটি তিনি চলে যাওয়ার পর বিস্ফোরিত হওয়ার কারণে ঐ যাত্রায় বেঁচে যায় গর্ডন৷পুলিশের চোখকে ধুলো দিতে রাসবিহারী বসু ছিলেন অসম্ভব পারবর্শী৷এদিকে পুলিশ যেন আরও ক্ষিপ্র, নজরদারীও বাড়ছে৷ওদিকে বিপ্লবীরা বুঝলেন বারাণসী আর নিরাপদ নয়৷ ওই বছর রাসবিহারী সন্ন্যাসীর বেশে তার সহযোদ্ধাদের নিয়ে কাশী চলে যান। সেই সময় বিপ্লবী শচীন্দ্রনাথ সান্যাল কাশীতে ঢাকা ‘অনুশীলন সমিতি’র একটি শাখা স্থাপন করেছেন৷ কিন্তু দিল্লী ও লাহোর ষড়যন্ত্রের পর ব্রিটিশ সরকার ‘অনুশীলন সমিতি’কে নিষিদ্ধ ঘোষনা করে।কিন্তু তাতে বিপ্লবীদের কি যায় আসে৷ ‘অনুশীলন সমিতি’ নাম পরিবর্তিত হয়ে তৈরি হয় ‘ছাত্র-যুব সঙ্ঘ’৷মতাদর্শ এক,উদ্দেশ্যও এক,সশস্ত্র পথে ভারতের স্বাধীনতা অর্জন৷ কাশীতে রাসবিহারী ‘ছাত্র-যুব সঙ্ঘ’-এর সাথে যুক্ত হন নেতৃত্বের দায়িত্ব নেন।

ছবিঃ সংগ্রহিত।

সঙ্ঘের সদস্যরা অস্ত্র চালানো ও বোমা নিক্ষেপ প্রশিক্ষণ নিতেন৷তবে তিনি বাইরে বের হতেন না,বিশেষত দিনের বেলা৷ নানা নামে নানা পরিচয়ে চলাফেরা করতেন। রাসবিহারীর কাছে তথ্য এল গদর পার্টির চার হাজার সদস্য আমেরিকা থেকে বিদ্রোহের জন্য ভারতে এসেছেন। বিদ্রোহ শুরু হলে আরো ২০ হাজার সদস্য ভারতে আসবেন৷তারাও দেশের জন্য,স্বাধীনতার জন্য আত্মবলিদান দিতে প্রস্তুত৷ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে ভারতীয় বংশোদ্ভূত সৈন্যবাহিনীর মধ্যে সশস্ত্র  বিদ্রোহের জাগরণ সৃষ্টি করতে অবিরাম তিনি কাজ করেছেন৷অতি গোপনীয়তায় এইসব সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছেন রাসবিহারী বসু সহ অন্য বিপ্লবীরা৷ওদিকে দেশ-বিদেশ থেকে বিপ্লবী গদর পার্টির হাজার হাজার সশস্ত্র সদস্যের অংশগ্রহণও সুনিশ্চিত।বিপুল পরিমান আগ্নেয়াস্ত্র আর  গোলাবারুদের ভান্ডার গোপনে ততদিনে গড়ে তুলেছেন বিপ্লবীরা৷

১৯১৫ সালে ‘ছাত্র-যুব সঙ্ঘে’র একটি সভায় দেশের জন্য আত্মবলিদানের প্রস্তুতির কথা বিপ্লবীদের স্মরন করিয়ে দিলেন৷ শচীন্দ্রনাথ সান্যালের সহযোগিতায় বেনারস, দানাপুর, সিকোল, এলাহাবাদ, জব্বলপুর, মীরাট, দিল্লী, রাওয়ালপিন্ডি, লাহোর, আম্বালা, পাঞ্জাব প্রভৃতি স্থানের সৈন্যদের ‘জাতীয় অভ্যুত্থানের’ জন্য অনুপ্রাণিত করে তাদেরকে প্রস্তুত হতে বলেন৷ সকল প্রস্তুতি যখন প্রায় শেষ৷ বিদ্রোহ ঘটানোর দিনক্ষন চুড়ান্ত৷ ১৯ ফেব্রুয়ারি,১৯১৫৷ প্রধান লক্ষ্যস্থল পাঞ্জাব প্রদেশের লাহোর। সেই সঙ্গে বারাণসী ও জব্বলপুর সেনা ঘাঁটিও প্রস্তুত৷ লাহোরে ৪টি গুপ্তস্থানে এই সশস্ত্র বিপ্লবী বাহিনীর প্রধান গুপ্ত দপ্তর ছিল৷

কিন্তু বিশ্বাসঘাতক বিপ্লবী রামশরণ দাস(অবাঙালি) বিদ্রোহের ঠিক ৪ দিন পূর্বে বিপ্লবীদের এই পরিকল্পনার কথা যথারীতি ব্রিটিশদের কাছে ফাঁস করে দেয়৷ব্রিটিশরা যথাসম্ভব সৈন্য পাঠিয়ে যেখানে যেখানে সম্ভব ভারতীয় সৈন্যদেরকে অস্ত্রহীন করে এবং ১৯ ফেব্রুয়ারি বিপ্লবীদের ৪ প্রধান দপ্তরের একটিতে অকস্মাৎ হামলা চালায়।ওদিকে বিপ্লবীরা ১৯ তারিখ সন্ধ্যেবেলায় লাহোরে  ব্রিটিশ সেনানিবাসে হামলা চালিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এই সশস্ত্র হামলায় দুপক্ষের বিস্তর ক্ষয়-ক্ষতি হয়৷অনেক বিপ্লবী দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মবলিদান দেন৷বিপ্লবীদের এই কর্মকান্ড লাহোর থেকে গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ে৷বিপ্লবের চেতনা যেন আরও অনেক ছাত্র,যুব,তরুনদের মধ্যে জাগ্রত হয়৷ কিন্তু মিশন ব্যর্থ হওয়ায় বহু বিপ্লবী গ্রেপ্তার এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন।আবার গা ঢাকা কাশী থেকে,এবার গন্তব্য কলকাতা৷ পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিতে তিনি কখনো নারী বেশে, কখনো দারোয়ান বেশে চলতেন তিনি।

 

 

বাংলাদেশ সময়: ১০:৫১ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২৫ মে ২০২০

রয়াল বেঙ্গাল নিউজ.কম |

Development by: webnewsdesign.com

Translate »