ব্রেকিং নিউজ

x


“ক্ষমা”

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২০ | ১১:৫৪ পূর্বাহ্ণ

“ক্ষমা”
দেবী গফফার

এখন আমি ৭০ ছুঁই ছুঁই।চোখের দৃষ্টি ঝাপসা। দাড়াতে গেলে শরীর কাঁপে।
অনেকদিন বাঁচতে চেয়েছি, কিন্তু কেমন যেনো অবসাদ লাগে, রাতে ঘুম হয় না।
সকালের দিকে একটু ঘুমিয়ে পড়ি, প্রতিদিন মানুষটা স্বপ্নে আসে।
স্যু টেড বুটেড, হাতে একটা লাগেজ।
গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে বলে চলো চলো।
এক ই স্বপ্ন প্রতিদিন।
উনি আমার প্রথম স্বামী নাম?
রায়হান তালুকদার।
৩৫ বছর আগে মারা গেছে।
ঘুম ভাঙ্গলেই মন খারাপ হয়, কেনো ডাকে।
চোখে করুন আকুতি।
রায়হান কি ক্ষমা চায়?
আমাকে দেওয়া কষ্ট গুলো তাকে বারবার আমার কাছে নিয়ে আসছে কি?
কোন কোন অপরাধ ক্ষমা করবো?
আমার বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরা দেখে প্রতিবাদ করেছিলাম বলে, বেধড়ক পিটিয়ে ছিলো। মারতে মারতে শাড়ি কেড়ে নিয়ে পেটিকোট পরা অবস্থায় রাতের অন্ধকারে বাসা থেকে বের করে দিয়েছিলো।
সেদিন আমি একবারও কাঁদতে পারি নি।
একটু অবাক হয়েছিলাম।
আর ও কতো কিছু যে মনে পড়ে।
সেই পনেরো ষোল বছরের আমি ভয়ে ভয়ে বলেছিলাম, আমি বাসায় বসে আবার পড়াশোনা শুরু করি?
উত্তর এসেছিলোঃ এটা আমার বাসা, কোন ছিনালের কারখানা নয়।
সেদিন ভেবেছিলাম আমার বাসা কবে হবে?
আমার একটা পৃথিবী কবে হবে?
এই পৃথিবীর কিসের উপর আমার অধিকার আছে?
শুধু আমার মনের উপর ছাড়া আমার কোন কিছু করার অধিকার নেই,
মনে মনে কতো কিছুর মালিক সাজি।
রাত জেগে বাচ্চা পালি রান্না করি,
এই আমার জীবন।
কেটে গেলো দশ বছর, এক নিয়মে।
আমার পৃথিবীর মালিকের চেহারা নোংরা কদাকার হতে থাকে,

একদিন জিজ্ঞেস করেছিলামঃ আচ্ছা? কাজের মেয়েদের শরীরের আদা রশুনের গন্ধ আপনার এতো ভালো লাগে কেনো?
উত্তর এসেছিলোঃ ওরা তোমার চেয়ে ভালো রাধে।
কেনো যেনো সেদিন দুচোখ বড্ড জ্বালা করেছিলো।
ফোটা ফোটা ঘৃনা জন্মাতে থাকে।
বিশ বছরের ছোটবড় আমরা, আমাদের দুরত্ব বাড়তে থাকে।
প্রতিদিন তৃষ্ণার্ত নয়নে অপেক্ষা করি তালুকদার জড়িয়ে ধরে বলবেঃ সব ভুল ছিলো বউ।
ক্ষমা করো।
আমার সব ঘৃণা নিমেষে উড়ে যেতো।
আমি দু চোখের পানিতে তাকে বরণ করতাম।
না কোনদিন বলেনি, ভুল ছিলো, কোনদিন বলেনি চলো নতুন করে জীবন শুরু করি।
একদিন আবিষ্কার করি আমাদের শোবার ঘর আলাদা হয়েছে।
তালুকদার এর রুমে কাজের মেয়েদের আনাগোনা বেড়েছে কেবল।
ততদিনে আমি বুজে গিয়েছি, আমার পৃথিবী আধা আলো আধা অন্ধকারে আমাকে পথ দেখাচ্ছে।
তখন আমি ২৭ বছরের একজন মা মাত্র।
এই সত্তর বছর বয়সে এসে এসব মনে পড়ছে কেনো কে জানে, ভুলে যাওয়া উচিৎ ছিলো।
হ্যা ক্ষমা চেয়েছিলো, মারা যাওয়ার তিন মাস আগে।
কোন সন্ধ্যায় বাসায় ফেরৎ এসেছিলো, অসহায় হয়ে বলেছিলোঃ আমি আর বাঁচবো না।
শুনে আমার মাথা একটুও চক্কর দেয়নি।
কোথায় যেনো রিনিঝিনি নুপুরের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম।
আল্লাহ্ এমন কেনো হচ্ছে, ক্ষমা করো ক্ষমা করো।
চোখের পানি কই?
চোখের পানি কখন শেষ হয়ে গেলো?
তালুকদার এর লিভার শেষ পর্যায়ে ছিলো, লোকটা হাটতে পারছে না।
আমি হুইল চেয়ার ঠেলি, আর আকাশের দিকে তাকিয়ে বিরবির করিঃ তোমার বিচার এতো কঠিন কেনো?
বারবার ক্ষমা চাওয়া তালুকদার কে ক্ষমা করতে পেরেছি কি না জানি না।
তালুকদার চলে গেলো, দিয়ে গেলো জীবনে মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার।



“জীবন চলার পথে অনেকের সাথে কথা হয়।
তাদের ই একজনের গল্প”

বাংলাদেশ সময়: ১১:৫৪ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২০

রয়াল বেঙ্গাল নিউজ.কম |

Development by: webnewsdesign.com

Translate »