ব্রেকিং নিউজ

x


বর্ষার বিদায়ের পরে শরতের আগমনে প্রকৃতি রঙ ছড়াচ্ছে সৌন্দর্যের

শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৬:০১ অপরাহ্ণ

বর্ষার বিদায়ের পরে শরতের আগমনে প্রকৃতি রঙ ছড়াচ্ছে সৌন্দর্যের

বর্ষারানী সিংহাসন ছাড়তে নারাজ হলেও ঋতুর সিংহাসনটা এখন শরতেরই। শুরুর দিকে শারদীয় মেঘ হটিয়ে বর্ষার রাজত্ব চলছে বটে, তবে ভাদ্র-আশ্বিন এ দু’মাস নীল আকাশ, নদীর পাড় আর বাতাসের সুগন্ধে ছড়িয়ে যাবে শরৎ ঋতু। শরতের আগমন সম্পর্কে কবি বলেছেন, ‘আজি শরৎ তপনে প্রভাত স্বপনে কী জানি পরান কী যে চায় ওই শেফালির শাখে কী বলিয়া ডাকে বিহগ বিহগী কী যে গায় গো আজি মধুর বাতাসে হৃদয় উদাসে, রহে না আবাসে মন হায় কোন কুসুমের আশে কোন ফুলবাসে সুনীল আকাশে মন ধায় গো। ছয় ঋতুর দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। বিশ্বের সকল দেশে ছয়টি ঋতুর আগমন কখনই ঘটে না। বাংলাদেশে প্রতি ঋতুরই রয়েছে আলাদা পরিচায়ক। আর ঋতুর পার্থক্য ফুটে ওঠে ফুলে। শরতে সাদা কাশফুল আর শিউলির আধিপত্য ছাড়াও ফোটে আরও অনেক সহচরী ফুল। শরৎকালে ঝকঝকে নীল আকাশ। মৃদু বাতাস দোলা দিচ্ছে তাদের নরম পাপড়িতে। এই তো চিরচেনা শরত। কাশফুল শিশির ভেজা সবুজ ঘাসের বিছানায় রাশি রাশি শিউলি ফুল। যেন খসে পড়েছে রাতের ঝলমলে তারা। মাটিতে মিশে গেছে তার গন্ধ। ছোট ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে নামে শিউলি ফুল কুড়োতে। আর পাল্লা দিয়ে চলে মালা গাঁথার প্রতিযোগিতা, কিন্তু এখনকার সময়ে সবই স্মৃতি। জাফরানি বোঁটার দুধসাদা ছয় পাপড়ির এ ফুল রাতে ফোটে ও সকালে ঝরে পড়ে। বেলি ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করে রাতের আকাশ। বেলি ফুলের ঘ্রান আর পাপড়ি সাজানো বেলি। বেলি ফুল বর্ষার ফুল হলেও ফোটে শরতে। বর্ষার ফুল দোলনচাঁপা শরতেও ছড়ায় তার সুবাস। শরতের সন্ধ্যায় দোলনচাঁপার সাদা পাপড়ি যেন আওড়ায় প্রিয় কোনো প্রেম কাব্য। এ ছাড়াও শরতে জবা ও পদ্মফুলও ফোটে। পদ্মফুলের লাল ও সাদার আভা দেখতে কতই না সুন্দর। শুধু দেখতে ইচ্ছে পাপড়ির ছড়া বহু গুচ্ছময় পদ্ম ফুলকে। এই নিস্তব্ধতা যেন কাশ-শিউলির কোমল পাপড়িকে স্বাগত জানাতে। এভাবেই শারদীয় দিন আসে, আসে শরৎ শুভ্রতার প্রতীক হয়ে। শরতের আকাশ কখনেও ধোয়ামোছা, পরিচ্ছন্ন হয় না। তার নীলচে বুকছেঁড়া মেঘের আবরণে ঢেকে রাখতে চায় নিজেকে। ধীরে ধীরে বর্ষার সেই উত্তাল ঢেউয়ের ভয়াবহ নদীটাও একসময় শান্ত হয়ে আসে। বর্ষার-বর্ষণমুখর অনুজ্জ্বল দিনের পর শরতের মেঘের মতো আমাদের মনও যেন হালকা হয়ে আসে। স্বপ্নের মতোই মনে হয় শরতের দিনগুলোকে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকে অনেক স্বপ্ন। আমরা সেসব স্বপ্ন কুড়িয়ে নিয়ে ভাবতে বসি কত কিছু! শরতের আকাশ, শরতের নদী, শরতের ফুল এই সবকিছুই কেমন যেন শান্ত-মায়াময়। শরতের এই শুভ্র রূপ পবিত্রতার প্রতীক। বিলের শাপলা, নদীতীরের কাশফুল, আঙিনার শিউলি—সবই কোমল এবং পবিত্র। যখন শিশিরের শব্দের মতো টুপটাপ শিউলি ঝরে তখন আসে অনুভবের শরৎ। কাশবনে দল বেঁধে আসে চড়ুই পাখিরা। শান্ত নদীতে দু’কূল ছাপানো ঢেউয়ের বদলে দৃশ্যমান হয় কাশবনের ছোট ছোট রুপালি ঢেউ।

শরতের স্নিগ্ধতাকে আরও মোহময় করে এ মৌসুমের বিচিত্র ফুলেরা। নদী কিংবা জলার ধারে ফোটে কাশ-কুশ, ঘরের আঙিনায় ফোটে শিউলি বা শেফালি, খাল-বিল-পুকুর-ডোবায় থাকে অসংখ্য জলজ ফুল। শরৎ মানেই শিউলির মধুগন্ধ ভেসে বেড়ানোর দিন। শিউলির আরেক নাম শেফালি। শিউলি বা শেফালি যাই বলি না কেন চমৎকার এ ফুল নিয়ে দুটি গ্রিক ও ভারতীয় উপকথা আছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যক উপন্যাসে শিউলির বিশাল বন ও তার তীব্র ঘ্রাণের কথা বলা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ এরা সকলেই বারবার শিউলির প্রশংসা করেছেন। ফুলকলিরা মুখ তোলে সন্ধ্যায়। সূর্যের সঙ্গে এদের আড়ি, নিশিভোরেই ঝরে পড়ে মাটিতে। বোঁটার হলুদ রং টিকে থাকে বহুদিন। কাশ শরতের অনন্য ফুল। আবহমান বাংলার চিরায়ত ফুল। শরতে কাশবনের স্নিগ্ধ শোভা প্রকৃতিকে প্রাণবন্ত রাখে। কাশবনের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে যেতে হবে কোনো নদী কিংবা জলার ধারে। সেখানে বেশ নিশ্চিন্তেই ফোটে শুভ্র কাশ। তবে এখন আর আগের মতো কাশবন দেখা যায় না। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ তাদের হটিয়ে শুধু নিজেদের বেঁচে থাকার কথাই ভাবছে। সাদা মেঘের ভেলার সঙ্গে কাশফুলের সাদা ঢেউ শরতের প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার আনাচকানাচে কাশফুলের অপরূপ শোভা চোখে পড়ে। শ্রাবণ শেষে সাদা সাদা তুলোর মতো মেঘে ছেয়ে যায় আকাশ, মাঝেমধ্যে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়ে সেই মেঘ আরও হালকা হয়, আরও সাদা হয়। সে মেঘের ছায়া পড়ে নদীর ধারে, কাশবনে। মেঘ, আকাশ আর কাশফুলের ছায়া পড়ে নদীর নীলজলে। এমন মনোলোভা চিত্র কি আর সব সময় দেখা যায়? শরতের পুষ্পতালিকা ততটা দীর্ঘ নয়। যা কিছু আছে, সেগুলোর প্রাধান্য দিয়েই গড়তে হবে নান্দনিক প্রকৃতি। শহরের প্রধান সড়কগুলোয় কাশ-শিউলি ও পদ্ম লাগানো যেতে পারে। পদ্মের জন্য আলাদা করে চাড়ি বা চৌবাচ্চাও তৈরি করে নেওয়া যেতে পারে। তা ছাড়া শহরের নির্দিষ্ট দু‘ একটি পুকুরেও এককভাবে পদ্ম থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিপন্ন সাদা পদ্মের প্রাধান্য থাকতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো পথে আর্চের ওপর থাকতে পারে সাদা ও গোলাপি রঙের অনন্তলতা। তবে এসব আয়োজনের পরিপূর্ণ সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য নিবিড় পরিচর্যা প্রয়োজন। আবার শহর লাগোয়া কোনো একটি বিল বা নদীর তীর নির্বাচন করা যেতে পারে। তাতে নিকটবর্তী দূরত্বে কাশ এবং অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে শিউলি থাকতে পারে। বর্ষার কিছু কিছু ফুলের রেশ শরতেও থাকে, যেমন বিলেতি জারুল। খুঁজে নিয়ে সেগুলোও শরতের শহরে নিয়ে আসা যায়। পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানে দুপুরমণি এবং স্থলপদ্ম থাকলে আরও ভালো লাগবে। শরতের স্তব্ধতা দূর গ্রামের দিগন্তরেখার নিচে ঘনায়মান সন্ধ্যার মতোই শান্ত ও মধুর। এমন মধুর একটি ঋতু শুধু ভাবনায় নয়, বাস্তবেও নির্মাণ করা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু উদ্যোগ, আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা। মনে হয় বাংলাদেশের শরৎ ঋতুর সব সৌন্দর্যের প্রতীকই চিরন্তর প্রহরী। পথিকদের স্বাগতম জানান দেয় শরৎ ঋতু। বলায় যায় বাংলাদেশ শুধু সুন্দর নয়, অপূর্ব, অতূলনীয় ও অসাধারণ সুন্দর। বাংলাদেশের ঐতিহ্যময় সংস্কৃতি তাদের মুগ্ধ করেছে।কেননা, প্রকৃতির সবুজ-শ্যামল রূপ যেনএ দেশের সংস্কৃতিকে সম্পদশালী করে তুলেছে।সংস্কৃতির এই রূপ ধরা পড়েছে এ দেশের সঙ্গীতে এবং মানুষের গানে। বাংলাদেশের মানুষ মাটির মানুষ। প্রকৃতির কোলে তারা গান গেয়ে গেয়ে নিজেদের জীবন গড়ে তুলেছে। তাদের কণ্ঠে গান। সে গানে মাটির মানুষের প্রাণের ছোঁয়া। তাদের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, বিরহ-বেদনা, প্রেম ভালোবাসা যেন এ দেশের গানের মূল আর্তি। মাটির মানুষের জীবন, প্রকৃতি ও সমর্পিত হৃদয়ের অকপট আনন্দ ও বেদনা নিয়ে রচিত এ দেশের গান। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গীত এ দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতি এত সমৃদ্ধ যে অন্য কোনো দেশের সঙ্গীতের সঙ্গে তুলনা হয় না। নিজের ঐতিহ্যগত ভাব, ভাষা ও সুরে এ দেশের সঙ্গীত অতুলনীয়। নিজস্ব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এই চর্চার জন্যই এ দেশের সংস্কৃতি সমৃদ্ধ ও উন্নত। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গীত চিরায়ত। এ দেশের লোকজ সঙ্গীতে কোনো জটিলতা নেই।সহজ কথা, সরল সুর। তাই এর আবেদনও সহজ-সরল। বাংলাদেশের সঙ্গীতে সমাজের সব ক্ষেত্রের পরিচয় পাওয়া যায়। তাই গ্যেটে বলেছেন, ‘ফোকটেল ইজ দ্য ফাদার অফ অল ফিকশন অ্যান্ড ফোক সঙ ইজ দ্য মাদার অফ অল পোয়েট্রি।’ বাংলাদেশে মানুষের হৃদয়ের ভাব ও ভাষা যে সঙ্গীতে প্রতিফলিত, সেই ভাব ও ভাষায় রচিত হয়েছে শরতের গান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম এই ভাষাতে বর্ষার গান রচনা করে সঙ্গীত ভুবনকে আলোকিত করেছেন। করেছেন সমৃদ্ধ। বর্ষার বিদায় বেলায় শরতের আগমনে শারদীয় মেঘমালা।এবার শরতের শুরুর দিনটিতে রোদ ঢেকে ছিলো মেঘের পরতে। মেঘ শরতের হলেও তা ছিলো বর্ষার পক্ষে।বিঃদ্রঃ বড় লিখা।চলছে চলবেই।



বাংলাদেশ সময়: ৬:০১ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

রয়াল বেঙ্গাল নিউজ.কম |

Development by: webnewsdesign.com

Translate »